সোনিয়া তাসনিম খান।।
– ওর প্রোগ্রেস কেমন?
আলগোছে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেই সামনে। চেয়ারে মাথা নিচু করে যে মেয়েটি বসে, ঊষা, ওর হাতে থাকা মোবাইল থেকে মুখ না তুলে উত্তর করে
– আন্টি, ভাল। মাশাআল্লাহ। ও স্মার্ট আছে। একটু অ্যাটেনটিভ হলে আর কোন সমস্যা হয় না।
– হুম। দেখ বেশি আদর দিয়ে মাথায় তুল না। প্রয়োজনে শাসনও করবে। ঠিক আছে? সব ব্যাপারে কম্প্রোমাইজ কর না।
– জ্বী।
মিষ্টি একটা হাসি এল প্রতুত্তরে। ঊষা, আমার মেয়ের হাউস টিউটর। বাসায় এসে পড়ায়। সপ্তাহে পাঁচ দিন। সত্যি বলতে আমার মেয়েটা আমার কাছে একেবারেই পড়তে বসতে চায় না। একটা টপিক দ্বিতীয় বার লিখতে বা পড়তে বললেই হলো, পুরো পাড়া মাথায় করে তুলবে। তাই নানা যোগ বিয়োগ কষে অগত্যা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছি যে এতেই গৃহ শান্তি, আর সেই সঙ্গে আমার মস্তিষ্কেরও কিছু ছুটি মেলে। অগত্যা তাই সই। তাই উঠে পড়ে লাগলাম একজন ভাল টিচার খুঁজতে। সে যাই হোক, গুগল মামার বদৌলতে যেখানে পুরো পৃথিবী হাতের মুঠোয় চলে এসেছে সেখানে এই ঠাস বুনটের ভিড়ে ঠেসে থাকা ঢাকা শহরের ব্যস্ত ঘুড়ির সুতো নাটাইয়ে টেনে আনা মোটেই কঠিণ কোন বিষয় না। হলও তাই, একটা অনলাইন সাইটে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকেই ঊষার সঙ্গে পরিচয়, আর এরপর তো গল্পটা খুবই সহজ।
উচ্ছ্বল, প্রাণবন্ত মেয়ে। বিবিএ পড়ছে একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে। আত্মবিশ্বাসী, সেল্ফ ডিপেনডেন্ট এই মেয়েটি টিউশানি করে নিজের টুকিটাকি ব্যাপারগুলো নিজেই সামাল দিচ্ছে বেশ। ব্যাপারটা সত্যি খুব দারুণ লাগে আমার। প্রথম কদিনের মাঝেই দেখলাম ও আমার মেয়ের সাথে ওর সাইকোলোজিক্যাল কনট্রাক্ট বেশ মিলিয়ে নিয়েছে। মান্থলি টেস্ট, হাফইয়ার্লি এসবে রেজাল্টও আলহামদুলিল্লাহ সন্তোষজনক। তার চাইতে বড় কথা নিজের দায়িত্বের প্রতি ওর একটা আলাদা কেয়ার কাজ করে যেটা সকলের মাঝে উপস্থিত থাকে না। সে যাই হোক, সব মিলিয়ে খুব খুশি হলাম এই দেখে যে মেয়েও তার টিচারের সান্নিধ্য বেশ উপভোগ করছে। প্রতিদিন পড়া শেষে ওর সঙ্গে টুকটাক নানা কথা হয়, গল্প হয়, ভালই লাগে বেশ। সময়টা কেমন শরতের নির্ভার মেঘের মত ভেসে যায় বুঝতেই পারি না। এটা সত্যি, কেন যেন জানি না, ওর মুখে আন্টি ডাকটা শুনতে আমার ভীষণ ভাল লাগে। অনুভূতিটা অনেকটা এমন যে এই ডাকটা বুঝি ডাকার জন্য ডাকা নয় এতে কেমন এক আপন আপন ঘ্রাণ মিশে রয়। তাই সহজেই অনুমেয় কখন, কি করে, কিভাবে ওর ওপর এত মায়া জন্ম নিল মনে তা সত্যি বুঝতে পারি নি। এমন করেই আসলে আমার পরিবারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশই ও হয়ে গেল অনায়সেই। আমার বাসার যে কোন অকেশানে, যে কোন আনন্দঘন মুহুর্তে ওর উপস্থিতি একটা বাড়তি মাত্রা যোগ করে নেয়। ওর সঙ্গে গল্প করবার সময় ও প্রায়ই আমাকে একটা কথা বলে
– আপনি অনেক ফ্রেন্ডলি…
– তাই নাকি? কি জানি?…
ওর কথার উত্তরও দেই হাসি দিয়ে। এভাবেই যাচ্ছে চলে দিন আলহামদুলিল্লাহ। হাসি, ঠাট্টা, গল্প, উপদেশের ফুলঝুড়ি আমাদের এই খালা ভাগ্নীর সম্পর্কের মাঝে এক পাঁচমিশালি স্বাদ নিয়ে আসে দারুণ ভাবে। এমনি এক দিনের কথা; আমার মনটা সেদিন কোন এক কারণে ভাল নেই। পিচ্চিকে পড়ানো শেষে ও চলে যাবে তো যাবার আগে আমার সঙ্গে অন্য সব সময়ের মতই কথা বলতে এল।
– আন্টি আসি
– হুম
ছোট করে জবাব দেই।
– আপনার কি মন খারাপ?
– নাহ!
– মনে হচ্ছে
– না। আসলে…
আমার কথাটা শেষ হয় না। ওর মোবাইলে রিং টোন বেজে ওঠে। ওর নেক্সট টিউশানের কল। ফোন কানে নিয়ে টুকটাক যা বলল তাতে কেন যেন মনে হল ও কিছুটা ডিস্টার্বড।
– কোন সমস্যা?
ফোন নামানোর পর জিজ্ঞাসা করি ওকে
- না। ঐ নেক্সট টিউশানটা এত প্যারা দিচ্ছে।
– হুম।
আমি অবশ্য শুনেছিলাম ওর কাছে এই ব্যাপারে হালকা পাতলা। তাই বললাম
– তা ছেড়ে দিস না কেন?
- হুম ভাবছি। কিন্তু বলতে পারি না কেন জানি!
-গুড। তাহলে আর কি! ভাবার মাঝেই থাক।
- আন্টির কি মন খারাপ?
আবারও একই প্রশ্ন। এবারে উত্তর করেই নেই
- একটু। কেন যেন মনে হয় দুনিয়াতে আসলে কাওকে কখনও খুশি করা যায় না। জীবন ভর সবার জন্য করে যাও সমস্যা নেই কিন্তু তোমার লিমিটেশানস এর কারণে একটু ঊনিশ বিশ হলো তো ব্যাস! ওটাই বড় ব্যাপার। আগের সব ব্যাপার ধোঁয়ার মত বাতাসে মিলিয়ে যায়।
- হয় আন্টি এমন।
– হুম। এজন্য মরে যাওয়াই ভাল জলদি। ঝামেলা শেষ।
– কি যে বলেন! এগুলা বললে কিন্তু আর আসব না।
ওর কথায় হেসে ফেলি বলি
– এই যে দেখলি, এই যে, ‘আসবি না’ কথাটা আমাকে কত সহজে বলে দিলি অথচ যেখানে আসব না বলা বেশি জরুরী সেখানে কিন্তু বলিস না। তাই তো বলি, পৃথিবীর নিয়মটাই এমন।
- কথাটা আমি আমার অধিকার থেকে বলছি। যে স্নেহ আর আদর আপনি আমাকে দেন এটা সেই অধিকার থেকে বলা, আমার স্টুডেন্টের গার্ডিয়ান হিসেবে না।
কথাটা বলেই ওর ঝলমলে উচ্ছ্বল হাসিটা দেয় আবারও। ছোট্ট কথা কিন্তু এর মাঝে কোথায় যেন একটা গাঢ় অনুভূতি মেশানো ছিল। তাই কিছু না বলে চুপ করে থাকি। ইতিমধ্যে বাড়ির নিচে বাইকের হর্ণ শোনা যাচ্ছে। হ্যাঁ। ঊষাকে নিয়ে যাবার জন্য ওর বাবা এসে গেছে। প্রতিদিন এই মিষ্টি মেয়েটার মাথার ওপর বটগাছের মত স্নেহ আর নিরাপত্তার ছায়া দিয়ে আগলে রাখেন উনি। ভীষণ, ভীষণ ভাল লাগে বাবা মেয়ের সম্পর্কের এই মিষ্টি রসায়ন। গাড়ির ভেঁপু একনাগাড়ে চেঁচিয়েই যাচ্ছে।
- আন্টি যাই। বাবা আসছে। আপনি মন ভাল করেন। কাল দেখা হবে। আর যদি কোন দরকার হয় আমাকে কল কইরেন। কইরেন কিন্তু। প্রমিজ করেন।
পিচ্চি মেয়েটার কথার মাঝে প্রচ্ছন্ন একটা জিদ অথবা আব্দার যাই বলি না কেন ওটা বেশ অনুভব করতে পারি। ওর হাতটা সামনে বাড়ানো। কপালের ওপর তিন চারটে চুল এসে পড়াতে আরও আদুরে দেখাচ্ছে। মায়া ভরা মুখটাতে ভরা জোৎস্নার ন্যায় খেলে বেড়াচ্ছে সেই সুন্দর হাসি। ওকে দেখে আমিও মুচকি হাসি, হাসি। বলি
– হুম। প্রমিজ।
– আসি, তাহলে। আল্লাহ হাফেজ। কাল দেখা হবে ইনশাআল্লাহ।
– ইনশাআল্লাহ। সাবধানে যাস।
- আচ্ছা…
কথাটা বলে ঝড়ের বেগে সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নিচে নেমে যায় ও। জায়গাটাতে এখন শূণ্যতা খেলে বেড়াচ্ছে। সিঁড়ি ঘরের ঘোলাটে কাঁচের ওপারে জমাট বাঁধা রৌদ্র কিশোরী মল পায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কতক্ষণ ফাঁকা সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে থাকি। কানে বাজে ওর বলা কথাটা
– আমি আপনাকে কথাটা বলছি অধিকার থেকে…
এইবারে আনমনে হেসে ফেলি। অবাক কান্ড! খেয়াল হলো, এতক্ষণের মন খারাপটাও পোঁজা তুলোর মত উড়ে গেছে। মনটা ভরে উঠেছে এক অদ্ভুত ভাল লাগাতে। কি আশ্চর্য! এমন সম্পর্কের ডোর গুলো। কোন কারণ, কোন যুক্তি, কোন চাওয়া পাওয়ার উর্ধ্বে জন্ম নেওয়া এই পবিত্র অনুভূতি সব কেমন বিনি সুতোর মালার মত জুড়ে দেয় হৃদয়ের বন্ধনগুলোকে। মনের অগোচরে জন্ম নেওয়া এমন সুন্দর নিটোল অনুভূতিগুলোর জন্যই পৃথিবীটা সত্যি এখনও এত সুন্দর। আর হ্যাঁ, ঠিক এজন্যই বুঝি সম্পর্কের প্রতি মানুষের আস্থা আজও এত অবিচল। আর কে জানে? মনে হয়, এমন করেই মিষ্টি, মধুর, আবেগী সব অধিকার উৎসুক ঘাস ফুলের মতই হৃদয়ের শ্যামল বাগিচায় উঁকি দিয়ে যায় চুপিসারে, একান্তই নিভৃতে আর সঙ্গোপনে…
Leave a Reply